Saturday, November 23, 2013

দারসুল কোরআন-২


                                                           দারসুল কোরআন-
           বিষয়: ইসলামী আন্দোলন তথা, বায়আতের গুরুত্ব।
           সূরা: আত্ তাওবা। আয়াত:১১১-১১২
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّلَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْأَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِيبَايَعْتُم بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
﴿التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَالسَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنكَرِوَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ ۗ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ﴾(১১২)
আয়াতের অনুবাদ: 
          (১১১) প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই কর এবং মারে ও মরে । তাদের প্রতি তাওরাত, ইন্জিল ও কুরআনে (জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়্দাা বিশেষ। আর আল্লাহর চাইতে বেশী ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে ? কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনা বেছা করছো সে জন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।
           (১১২) আল্লাহর দিকে বার বার প্রত্যাগমনকারী, তার ইবাদত কারী,তার প্রশংসা বাণী উচ্চারণ কারী, তার সামনে রুকু কারী ও সেজদা কারী, সৎ কাজের আদেশ কারী, অসৎ কাজ থেকে বিরতকারী এবং আল্লাহর সীমা সংরক্ষনকারী (সেই সব মুমিন হয়ে থাকে যারা আল্লাহর সাথে কেনা বেচার সওদা করে)। আর হে নবী! এ মুমিনদেরকে সুখবর দাও! 
সূরা আত্ তাওবার নাম করন: এ সূরাটির দু’টি নামে পরিচিত: আত্ তাওবাহ ও আল বারাআতু। তাওবা নাম করনের কারণ, এ সূরার ১১৮ নং আয়াতে কতিপয় ঈমানদারের গোনাহ মাফ করে তাওবা বতবুল করার কথ বলা হয়েছে। আর এর শুরুতে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কথা ঘোষনা করা হয়েছে বলে একে বারায়াত (অর্থাৎ সম্পর্কচ্ছেদ) নামে অভিহিত করা হয়েছে।
সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ না লেখার কারণ: 
১.এটা যখন সংকলন করা হয় তখন সাহাবীদের মধ্যে মতা নৈক্য দেখা দেয়- কেহ কেহ বলেন এই সূরা আনফালের অংশ অথবা কেহ কেহ বলেন- আলাদা সূরা।
২.বিসমিল্লাহ্ হলো রহমত কামনা ও নিরাপত্তার জন্য, আর এ সূরার মধ্যে কাফের মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা হয়েছে, তাই বিসমিল্লাহ্ লেখা হয়নি। 
৩.ইমাম কায়েশী বলেণ- জিব্রাঈল(আ.) এই সূরা নাযিলের সময় বিসমিল্লাহ নিয়ে আসেন নাই তাই। 
৪.ইমাম রাযী বলেন- নবী করিম (স:) নিজেই এর শুরুতে বিসমিল্লাহ লেখেন নি, কাজেই সাহাবা কেরাম ও লেখেন নি এবং পরবর্তী লোকেরা ও এ রীতি অনুসরণ অব্যাহত রেখেছেন। পবিত্র কুরআন যে নবী (স:) থেকে হুবুহু ও সামান্যতম পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়াই গ্রহন করা হয়েছিল এবং যে ভাবে তিনি দিয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই তাকে সংরক্ষন করার জন্য যে সর্বোচ্ছ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে এটি তার একটি প্রমাণ।
সূরা আত্ তাওবা নাযিলের সময়কাল: এ সূরা ৩টি ভাষনে নাযিল হয়।-
প্রথম ভাষণ: ১ম হতে ৫ম রুকুর শেষ পযর্ন্ত। এ অংশ ৯ম হিজরীর যিলক্বদ মাসে নাযিল হয়।
২য় ভাষণ: ৬ষ্ঠ রুকু থেকে ৯ম রুকুর শেষ পযর্ন্ত , ৯ম হিজরীর রজব মাসে নাযিল হয়।
তৃতীয় ভাষণ:১০ম রুকু থেকে সূরার শেষ পযর্ন্ত তাবুক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন কালে অবতীর্ণ হয়।
সূরা আত্ তাওবার বিষয় বস্তু: 
১.    বিধর্মীদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে (১ম রুকু)।
২.    তাবুক যুদ্ধের অভিযান (৬ষ্ঠ-১০ম রুকু)।
৩.    মুনাফিকদের পরিণাম ও পরলৌকিক শাস্তি।(৪২-৪৩,৪৭-৫৯,৬১-৬৮,৭৪-৯০,৯৩-৯৮,১০১,১০৭-১১০,১২৪ ও ১২৭ আয়াত)
৪.    মসজিদে জেরার নির্মাণের পরিণাম ও উহা ধ্বংস করার নির্দেশ ( ১০৮ নং আয়াত)।
৫.    শহীদের মর্যাদা, মাহাত্ম সৎপথে অর্থ ব্যয় এর পরিণাম (১৪তম রুকু)।
আলোচ্য আয়াতগুলোর শানে নুযুল: অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে এ আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে  ‘বায়আতে আকাবায়’ অংশগ্রহনকারী লোকদের ব্যাপারে।এ বায়’আত নেয়া হয়েছিল মক্কায় মদীনার আনসারদের থেকে। তাই এই সূরাটি মাদানী হওয়া সত্ত্বে ও এ আয়াতগুলোকে মাক্কী বলা হয়েছে।
আকাবা: “এখানে আকাবা বলতে বোঝায় মিনার জমরায়ে আকাবার সাথে মিলিত পর্বতাংশকে”। এখানে মদীনা থেকে আগত আনসারগণের তিন দফায় বায়আত নেয়া হয়। 
১.    ১ম দফা নেয়া হয় নবুয়তের একাদশ বছরে, তখন মোট ৬ জন লোক ইসলাম গ্রহন করে মদীনায় ফিরে যায়। এত মদীনার ঘরে ঘরে ইসলাম ও নবী করীম (স.) -এর চর্চা শুরু হয়। 
২.    ২য় দফায় পরবর্তী বছর হজ্জ্বের মৌসুমে পূর্বের ৫ জন সহ মোট ১২ জন নবী করিম (স.) এর হাতে বায়আত গ্রহন করে।  আর এভাবে মদীনায় মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে থাকে (৪০ জনের ও বেশী)। ফলে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নবী করিম (স.) হযরত মোসআব বিন উমাইর (রা:) কে কোরআন তালিমের জন্য প্রেরণ করেন।
৩.    ৩য় দফায় নবুয়তের ত্রয়োদশ বছর ৭০ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা সহ ৩য় ও সর্বশেষ বায়আত এ আকাবায় অনুষ্ঠিত হয়। ‘সাধারণত একেই বায়’আতে আকাবা বলা হয়।

আয়াতের ব্যাখ্যা : ১১১ নং আয়াত-
১.    ১১১ নং আয়াতটি-ই জিহাদ সংক্রান্ত ১ম আয়াত। কারন মুহাম্মদ (স.) মক্কায় অবস্থান কালে এ পযর্ন্ত জিহাদ সংক্রান্ত কোন হুকুম নাযিল হয়নি।
২.    জিহাদ অর্থ :-
৩.    জিহাদের সংজ্ঞা:-
৪.    জিহাদের স্তর : ৫ টি- 
১.    দাওয়াত ইলাল্লাহ।
২.    শাহাদাৎ আলান্ নাস।
৩.    কিতাল ফি-সাবিলিল্লাহ।
৪.    আমল বিল মা’রুফ নাহি আনিল মুনকার।
৫.    ইক্বামতে দ্বীন।
         যেমন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-﴿تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِبِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْتَعْلَمُونَ﴾
“তোমরা আল্লাহ ও রাসুল (স.) এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবন বাজি রেখে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের  জন্য উত্তম; যদি তোমরা বুঝতে পার”। (আস্ সফ-১১) 
জিহাদের সফলতা: 
১.    আখেরাতের সফলতা: আল্লাহ বলেন-﴿فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَابِالْآخِرَةِ ۚ وَمَن يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْفَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا﴾
“(এ সব লোকদের জেনে রাখা উচিত যে) আল্লাহর পথে লড়াই করা সে সব লোকদেরই কর্তব্য, যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রি করে দেয়। যারা আল্লাহর পথে লড়াই করবে ও নিহত হবে কিংবা বিজয়ী হবে, অচিরেই তাকে আমি  বিরাট পুরষ্কার দান করব”।(সূরানিসা: ৭৪)
২.    ﴿يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَاالْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُالْعَظِيمُ﴾
“আল্লাহ তোমাদেও সব গুণাহ মাফ কওে দিবেন এবং তোমাদের এমন বাগানে প্রবেশ করাবেন যার নীচ দিয়ে ঝর্ণাদ্বারা বহে চলবে।আর চির স্থায়ী বসবাসের জায়গা জান্নাতের মধ্যে তোমাদেরকে সর্বোত্তম ঘর দান করবেন। এটাই বড় সফলতা”। ( আছ্ ছফ-১২)
৩.    তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করা হবে যার নেয়ামত সমূহ অশেষ ও চিরন্তন। (আছ্ ছফ:১২-১৩)
শহীদের মর্যাদা: 
১.    প্রথম রক্তপাতেই তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।
২.    জান্নাতে তার স্থান তাকে দেখানো হবে (কবরে)।
৩.    কবরের আযাব থেকে তাকে রক্ষা করা হবে।
৪.    ‘কবরে’ বড় বিপদ আপদ থেকে নিরাপদ থাকবে।
৫.    হাশরের ময়দানে তার মাথায় একটা আকর্ষনীয় মূকুট পড়ানো হবে।
৬.    তাকে তার ৭০ জন আত্মীয়ের শাফায়াতের অনুমতি দেয়া হবে।
বাইয়াত: আভিধানিক অর্থ- ক্রয়- বিক্রয়, লেন-দেন, চুক্তি, আনুগত্যের শপথ, অঙ্গীকার, নেতৃত্ব মেনে নেয়া। একে ইংরেজীতে বলা হয়-  ঞড় ংবষষ, ঞড় নুঁ, ঞড় সধশব ধ পড়হঃৎধপঃ, অমৎববসবহঃ, অৎৎধহমবহসবহঃ, ইঁংরহবংং ফবধষ.
 পরিভাষায়- “আল্লাহর সন্তুষ্টি অজর্নের লক্ষ্যে নিজের জান ও মালকে ইসলামী সংগঠনের দায়িত্বশীলের নিকট আনুগত্যের শপথের মাধ্যমে আল্লাহর পথে সপে দেয়ার ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতির নাম বাইয়াত”।
( ফাতহ-১০, ১৮)
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِفَوْقَ أَيْدِيهِمْ ۚ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَىٰ نَفْسِهِ ۖ وَمَنْأَوْفَىٰ بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا(১০) 
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَالشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْوَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا(১৮)
বাইয়াতের ব্যাপক অর্থ- 
১.     আল্লাহর সাথে জান মালেন চুক্তি। -আত্ তাওবা:১১
২.    আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশে শপথ। - 
সকল ধরনের হারাম বা নিষেধকৃত কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চুক্তি। - মুমতাহিন: ১২﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُيُبَايِعْنَكَ عَلَىٰ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍيَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِيمَعْرُوفٍ ۙ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌرَّحِيمٌ﴾
১২) হে নবী, ঈমানদার নারীগণ যখন তোমার কাছে বাইয়াত গ্রহণরে জন্য আসে এবং এ র্মমে প্রতশ্রিুতি দয়ে য,ে তারা আল্লাহর সাথে কোন কছিুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যনিা করবে না, নজিদেরে সন্তানদরে হত্যা করবে না৷ সন্তান সর্ম্পকে কোন অপবাদ তরৈী করে আনবে না৷ এবং কোন ভাল কাজে তোমার অবাধ্য হবে না৷ তাহলে তাদরে থকেে বাইয়াত গ্রহণ করো এবং তাদরে মাগফরিাতরে জন্য দোয়া করো৷ নশ্চিয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মহেরেবান৷  
বাইয়াতের গুরুত্ব:
১.    নফ্স বা প্রবৃত্তি।
২.    ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি।
৩.    ইবলিশ।
 রাসূল (স.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়া মারা যাবে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। (মুসলিম)
বাইয়াতের ফজিলত:
১.    আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা বাস্তবায়ন এবং দুনিয়ার জীবনের চেয়ে পরকালের জীবনকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য। (আন্ নিসা-৭৪)
২.    আল্লাহর মাগফিরাত। ( আল ইমরান- ১৩৩, হাদীদ-১১৬)
৩.    সর্বোচ্চ ঈমানের অধিকারী হওয়া। (আল ইমরান-১০২)
৪.    পরকালীন নিশ্চিত সফলতার গ্যারান্টি। (আলা- ১৪, শামস্-৯)
৫.    জাহান্নামের আগুন থেকে বাচার জন্য। ( আস্ সফ-৯, শামস্-৯)
বাইয়াত কার নিকট করতে হবে: 
১.    আল্লাহর নিককট।
২.    রাসূল (স.) এর নিকট।
৩.    রাসূলের (স.) এর অবর্তমানে ইসলামী সংগঠনের নিকট।
বাইয়াতের অবস্থা: 
১.    ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া নামক স্থানে সাহাবীরা রাসূল (স.) এর হাতে বাবলা গাছের নীচে  হযরত ওসমান (রা:) হত্যার সংবাদে যে বাইয়াত গ্রহন করেন, তাকে বাইয়াতুল রিদওয়ান বলে।
২.    রাসূল (স.) এর ইন্তেকালের পরে খোলাফায়ে রাশেদীনের হাতে মুসলিম মিল্লাতের বাইয়াত গ্রহন মুসলিম জাতির জন্য বাস্তব দৃষ্টান্ত।
বাইয়াত পরিহার করার পরিণাম: 
১.    পরকালে পীড়াদায়ক শাস্তি। (বনী ইসরাঈল-৩৪, আন্ নাহল-৯১)
২.    জাহেলিয়াতের মৃত্যু।
৩.    কিয়ামতের  ময়দানে অপমান জনক চিহ্ন দ্বারা চিহ্নিত করবেন।

সূরা আত্ তাওবার ১১১ নং আয়াতে মৌলিকভাবে তিনটি কথা উল্লেখ যোগ্য। সেগুলো হল-
প্রথমত: আল্লাহর সাথে মুমিনদের ক্রয়-ব্ক্রিয়ের চুক্তি।
দ্বিতীয়ত: চুক্তি সম্পাদক করা মুমিনদের কাজ। আর সেটা হচ্ছে- জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ। যার ধরন হলো মরবে ও মারবে।
                                                                                     (সূরা তাওবা-৪১, আন নিসা-৭১ নং আয়াত)
তৃতীয়ত:  মুমিনগণ আল্লাহর সাথে যে বাইয়াত বা চুক্তি সম্পাদন করেছে তাদের জন্য সুসংবাদ এজন্যই যে, আল্লাহর এ জান্নাতের ওয়াদা সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত। আর আল্লাহর চাইতে অধিক প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী কেউ নেই।

১১২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা:-
 ১১২ নং আয়াতে বাইয়াত গ্রহনকারী মুমিনদের ৮ টি গুনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ১ম  সাতটি গুণের সংক্ষিপ্ত সার হলো ৮ম গুণ।
১.    আত্ তা‘য়িবুনা - তাওবাকারীগণ। অর্থাৎ যারা অপরাধ করার পর অনুতপ্ত হয়ে কৃত অপরাদের ক্ষমা চেয়ে তা আর না করার  ওয়াদা করে। (সূরা আল ইমরান- ৯০,১৩৫; নিসা- ১৭,১১০; আন আম- ৫৪; আরাফ-১৫৩;মুমিন-৩; আস্শুরা- ২৫; নাহল-১১৯;)
২.    আল আবিদুনা - ইবাদতকারীগণ। 
৩.    আল হামিদুনা - প্রশংসাকারীগণ, শুকরিয়াকারীগণ। অর্থাৎ যারা বিপদে-মুসিবতে, সুখে-দুখে, সবসময় আল্লাহর পশংসা করে। সূরা নসর-৩
৪.    আছ্ ছা‘য়িহুনা - পরিভ্রমণকারীগণ। কারো কারো মতে রোজা পালনকারীগণ। এখানে ইসলামের জন্য, জিহাদের জন্য ও হালাল রুজির জন্য ভ্রমন ও হতে পারে। ইসলাম পূর্ব যুগে খ্রীস্ট ধর্মে দেশ ভ্রমণকে ইবাদত মনে করা হতো। ইসলাম ধর্মে একে বৈরাগ্যবাদ বলে অভিহিত করে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে এবং এর পরিবর্তে রোযা পালনকে এর স্থলাভিসিক্ত করা হয়েছে। কারন দেশ ভ্রমনের উদ্দেশ্য সংসার ত্যাগ। অথচ রোযা এমন এক এবাদত, যা পালন করতে গিয়ে যাবতীয় পার্থিব বাসনা ত্যাগ করতে হয় এর ভিত্তিতে কতিপয় বণর্নাকরী জিহাদকে ও দেশ ভ্রমনের অনুরুপ বলা হয়। রাসূল (স.) বলেছেন- আমার উম্মতের দেশ ভ্রমণ হলো জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ। (ইবনে মাজা ও বায়হাকী) 
           হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, কুরআন মাজীদে ব্যবহ্নত ‘সা‘য়িহুন’ অর্থ রোযাদার। হযরত ইকরামা (রা:) এ শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এরা হলো দ্বীনের শিক্ষার্থী, যারা এলম হাসিলের জন্য ঘর-বাড়ী ছেড়ে বের পয়ে পড়ে।
৫.    র্আ রা‘কিয়ূনাস্ সাজিদুনা - রুকুকারী ও সিজদাকারীগণ। অর্থাৎ যারা নামাজ কায়েম করে। যেমন- সূরা হজ্জ: ৭৭, লোকমান: ১৭, আন কাবুত: ৪৫।
৬.    আল আ‘মীরুনা বিল মা‘রুফ - সৎ কাজের আদেশ দানকারী এবং ভালো কাজের নির্দেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ কারী। 

৭.    আন্ নাহু না আনীল মুনকার -  মন্দ ও খারাপ কাজের বাধাদান কারী।  
৮.    আল হাফিজুনা লি-হুদুদিল্লাহ -  আল্লাহর সীমা হিফাজত কারী, সংরক্ষনকারীগণ, আল্লাহর নিষেধ যথাযথভাবে পালনকারীগণ।
---- প্রথম সাতটি গুণের মধ্যে যে তফসিল রয়েছে , তার সংক্ষিপ্ত সার কথা হলো এ যে - এরা নিজেদের প্রতিটি কর্ম ও কথায় আল্লাহর নির্ধারিত তথা শরীয়তর হুকুমের অনুগত ও হেফাজতকারী। 

শিক্ষনীয় দিকঃ 
১.    আল্লাহর তায়ালা মুমিনদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন।
২.    আল্লাহর পথে জিহাদ করতে হবে, মরলে শহীদ বাচলে গাজী।
৩.    জিহাদের বিনিময়ে জান্নাত এটা আল্লাহর পাকাপোক্ত ওয়াদা।
৪.    আল্লাহর পথে জিহাদ করলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় সফলতা লাভ করা যায়।
৫.    মুমিনদের জীবনের একমাত্র কামনা হওয়া উচিত আল্লাহর পথে জিহাদ।
৬.    মুমিনের যে গুণগুলোর কথা বলা হয়েছে এগুলো পুরোপুরি নিজের জীবনে  বাস্তবায়ন করা।

দারসুল কোরআন-১

                                                                সূরা আত তাওবাহ
 আয়াত- ৩৮-৪১

 তেলাওয়াত ঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انفِرُوا فِيسَبِيلِ اللَّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ ۚ أَرَضِيتُم بِالْحَيَاةِالدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ ۚ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِإِلَّا قَلِيلٌ (৩৮)
إِلَّا تَنفِرُوا يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًاغَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْئًا ۗ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ(৩৯)
(৪০)إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُواثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْإِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ۖ فَأَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُبِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَىٰ ۗوَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
انفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِيسَبِيلِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ (৪১)
     সরল অনুবাদ ঃ
৩৮.    হে ঈমানদার লোকেরা, তোমাদের কি হয়েছে, তোমাদেরকে যখন আল্লাহর পথে বের হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তখন তোমরা যমিনের উপর বোঝায় নুয়ে পড়ছ? তোমরা কি পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে পছন্দ করে নিয়েছ? এই যদি হয়ে থাকে, তা হলে তোমাদের জেনে রাখা উচিৎ যে, দুনিয়ার জীবনের এসব সাজ-সরঞ্জাম পরকালে খুব সামান্যই বোধ হবে।
৩৯.    তোমরা যদি যুদ্ধ যাত্রা না কর, তাহলে তোমাদের পীড়া দায়ক শাস্তি দেয়া হবে এবং তোমাদের স্থলে অপর কোন লোক সমষ্টিকে (ভিন্ন আদর্শের কোন দলকে) প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তোমরা আল্লাহর কোন ক্ষতিই করতে পারবেনা। তিনি সর্ব বিষয়ে শক্তির আধার।
৪০.    তোমরা যদি তাকে (নবীকে) সাহায্য না কর, তাহলে সেজন্য কোনই পরোয়া নেই। আল্লাহ সেই সময় তার সাহায্য করেছেন, যখন কাফেররা তাকে বহিষ্কার করে দিয়েছিল, যখন সে মাত্র দু’জনের দ্বিতীয় ছিল। যখন তারা দুজন গুহায় অবস্থিত ছিল তখন সে তার সংগীকে বলেছিলঃ চিন্তাভাবনা করোনা, আল্লাহ আমাদের সংগে রয়েছেন। তখন আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় গভীর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাকে সাহায্য করলেন এমন সব সৈন্যবাহিনী দিয়ে, যা তোমাদের দৃষ্টিগোচর হত না এবং কাফেদের কথাকে নিচু করে দিলেন। আর আল্লাহর কথা তো সর্বোচ্চই। আল্লাহ বড়ই শক্তিমান ও সুবিজ্ঞ বিবেচক।
৪১.    তোমরা বের হয়ে পড়, হালকাভাবে কিংবা ভারী-ভারাক্রান্ত হয়ে। আর জেহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল-সামান ও নিজেদের জান প্রাণ সংগে নিয়ে; এ তোমাদের জন্য কল্যাণময় যদি তোমরা জান।
*নামকরণ ঃ
 *প্রসিদ্ধ দুটি নাম ঃ
 ১. তাওবাহ  ২. বারাআত
তাওবাহ ঃ ১১৭ নং আয়াত থেকে/ আয়াতে ঈমানদারদের গুনাহ খাতা মাফ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শব্দার্থ- ফিরে আসা।
বারাআহ ঃ সম্পর্কোচ্ছেদ করা। ১ম আয়াতের ১ম শব্দ মুশরিকদের সহিত সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা
*শুরুতে বিসমিল্লাহ না লিখার কারণ ঃ
ইমাম রাজী লিখেছেন- নবী করিম (সা.) নিজেই এ সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ লিখেননি। এ কারণে সাহাবায়ে আজমাঈন ও লিখেননি। পরবর্তীকালে লোকেরা ও তা অনুসরণ করেছে।
* শানে নুযুল ঃ [অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল]সম্পূর্ণ সুরাই মাদানী যুগে অবতীর্ণ।
সূরা আত্ তাওবা নাযিলের সময়কাল: এ সূরা ৩টি ভাষনে নাযিল হয়।-
প্রথম ভাষণ: ১ম হতে ৫ম রুকুর শেষ পযর্ন্ত। এ অংশ ৯ম হিজরীর যিলক্বদ মাসে নাযিল হয়।
২য় ভাষণ: ৬ষ্ঠ লুকু থেকে ৯ম রুকুর শেষ পযর্ন্ত , ৯ম হিজরীর রজব মাসে নাযিল হয়।
তৃতীয় ভাষণ:১০ম রুকু থেকে সূরার শেষ পযর্ন্ত তাবুক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন কালে অবতীর্ণ হয়।
*  তাবুক অভিযান ঃ (মুতা যুদ্ধের পরের বছর) কাইসার মুসলমানদের মুতা যুদ্ধের শাস্তি দেবার জন্য সিরিয়া সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি শুরু করে। তার অধীনে গাসসানী ও অন্যান্য আরব সর্দারেরা সৈন্য সমাবেশ করতে থাকে।
* চ্যালেঞ্জসমূহ ঃ
১.   দেশে দুর্ভিক্ষ চলছিল? আবহাওয়া ছিল প্রচন্ড গরম।
২.   ফসল পাকার সময় কাছে এসে গিয়েছিল।
৩.   সওয়ারী ও সাজ সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা বড়ই কঠিন ব্যাপার ছিল।
৪.   অর্থের অভাব ছিল প্রকট।
৫.   দুনিয়ার দুটি বৃহৎ শক্তির একটির মোকাবিলা করতে হচ্ছিল।
*  সূরা আত্ তাওবার বিষয় বস্তু:
* বিধর্মীদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে (১ম রুকু)।
* তাবুক যুদ্ধের অভিযান (৬ষ্ঠ-১০ম রুকু)।
* মুনাফিকদের পরিণাম ও পরলৌকিক শাস্তি।(৪২-৪৩,৪৭-৫৯,৬১-৬৮,৭৪-৯০,৯৩-৯৮,১০১,১০৭-১১০,১২৪ ও ১২৭ আয়াত)
*  মসজিদে জেরার নির্মাণের পরিণাম ও উহা ধ্বংস করার নির্দেশ ( ১০৮ নং আয়াত)।
* শহীদের মর্যাদা, মাহাত্ম সৎপথে অর্থ ব্যয় এর পরিণাম (১৪তম রুকু)।
মূল্য আলোচ্য বিষয় ঃ
(ক) পার্থিব জীবন ও আখেরাতের জীবনের তুলনা
(খ) আল্লাহর পথে বের না হওয়ার শাস্তি
(গ) যে কোন অবস্থায় আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়া।

*ব্যাখ্যা -

*৩৮ নং আয়াত ঃ
“হে ঈমানদার লোকেরা, তোমাদের কি হয়েছে, তোমাদেরকে যখন আল্লাহর পথে বের হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তখন তোমরা যমিনের উপর বোঝায় নুয়ে পড়ছ? তোমরা কি পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে পছন্দ করে নিয়েছ? এই যদি হয়ে থাকে, তা হলে তোমাদের জেনে রাখা উচিৎ যে, দুনিয়ার জীবনের এসব সাজ-সরঞ্জাম পরকালে খুব সামান্যই বোধ হবে”।
তোমাদের কি হল? তোমরা কেন বের হওনা? এ শব্দে আল্লাহ তায়ালা জিহাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে দুনিয়ার কাজে জড়িত থাকার প্রতি হুশিয়ারী প্রদান করেছেনÑ
একই প্রকার হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে সুরা নিসার ৭৫ নং আয়াতে
“তোমাদের কি হলো তোমরা কেন আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করছনা? সে সব অসহায় নর-নারী ও (দুস্থ) শিশু সন্তানদের জন্য যারা নির্যাতনে কাতর হয়ে ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের মালিক, আমাদের এ যালেমদের জনপদ থেকে বের করে (অন্যত্র) নিয়ে যাও, অতঃপর তুমি আমাদের জন্য তোমার কাছ থেকে একজন অভিভাবক (পাঠিয়ে) দাও, তোমার কাছ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী পাঠাও।
“তোমরা বেরিয়ে পড় দলভুক্ত হও, দলে দলে বেরিয়ে পড়, তোমরা যুদ্ধযাত্রা কর”                     * ইচ্ছাকালতুম,ইলাল,আরদ --  
তোমরা মাটি জড়িয়ে ধরো, মাটিকে আঁকড়িয়ে ধরো, মাটিকে অবলম্বন করে রাখো।
এখানে, দুনিয়ার লোভ লালসা, সন্তান সন্ততির ভালবাসা, দুনিয়ার চাকচিক্য ইত্যাদির প্রতি ঝুঁকে পড়ে জিহাদে যাওয়া থেকে বিরত থাকা।
রাসূল (সঃ) বলেছেন- দুনিয়ার মোহ সকল গোনাহের মূল।
আরাদিতুম বিল হায়াতিদ দুন ইয়া মিনাল আখিরাহ
তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গেলে অর্থাৎ আখেরাতের কল্যাণের চাইতে দুনিয়ার বৈষয়িক লোভ-লালসার প্রতি তোমাদের মনোযোগ বেশী?
ফামা মাতাডুল

।          ।

অথচ নয়  ভোগসামগ্রী
অথচ দুনিয়ার জীবনের ভোগ সামগ্রী আখেরাতের তুলনায় অতি তুচ্ছ।
ক্বালিলান অতি তুচ্ছ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে রাসূল (সঃ) তাঁর তর্জনীর প্রতি ঈঙ্গিত করে বলেন, “এ অঙ্গুলিটি কেউ সমুদ্রে ডুবিয়ে উঠালে তাতে যতটুকু পানি উঠবে, ঐ পানিটুকু সমুদ্রের তুলনায় যেমন, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া ও তেমন।”
এখানে আল্লাহ তায়ালা জিহাদের নির্দেশ দিয়ে বান্দাকে পরীক্ষা করে নিচ্ছেনÑ যারা দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে তারাই সফলকাম। সুরা আন কাবুতে ২নং আয়াতে আল্লাহ বলেন- আহসিবান্নাস
‘মানুষরা কি এটা মনে করে নিয়েছে যে, তাদের (শুধু) এটুকু বলার কারণেই ছেড়ে দেয়া হবে যে, আমরা ঈমান এনেছি এবং তাদের কোন রকম পরীক্ষা করা হবেনা’।
৩৮ নং আয়াতের শেষাংশের দুনিয়ার জীবনের ভোগ সামগ্রী আখেরাতে সামান্য প্রমাণিত হবে।
এর দুটো অর্থ এরকম হতে পারে
এক ঃ আখেরাতের অনন্ত জীবন এবং সীমা সংখ্যাহীন ভোগ সামগ্রী দেখার পর তোমরা জানতে পারবে, দুনিয়ার সুখাশ্চর্য এবং বিলাস সামগ্রী আখেরাতের সীমাহীন সম্ভাবনা এবং সেই অন্তহীন নিয়ামতে পরিপূর্ণ সুবিশাল রাজ্যের তুলনায় কিছুই নয় ( (Neglegible)। তোমরা তখন আফসোস করতে থাকবে।
দুই ঃ দুনিয়ার জীবনের বিলাস সামগ্রী আখেরাতে কোন কাজে লাগবে না। এখানে যতই ঐশ্বর্য সম্পদ ও সাজ সরঞ্জাম তোমরা সংগ্রহ করো না শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সাথে সাথেই সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে। এখানকার কোন জিনিসই তোমাদের সাথে স্থানান্তরিত হবে না। এখানকার সাজ-সরঞ্জাম, বিষয়াদি, সময়ের যে অংশটুকু তোমরা আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার জন্য কুরবানী করেছো এবং যে জিনিসকে ভালবাসার ওপর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি ভালবাসাকে প্রাধান্য দিয়েছে একমাত্র সেই অংশেই তোমরা সেখানে পাবে।
“আন আবি উমা মাতা (রাঃ) ক্বালা ক্বালা রাসুলিল্লাহি (সঃ) মান আহাব্বা লিল্লাহি-ওয়াবগাদা লিল্লাহি ওয়া আ’তা লিল্লাহ, ওয়ামানা-আ’লিল্লাহ ফাকাদ ইছতাকমালাল ঈমান।”
অর্থাৎ - আবি উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত রসূল (সঃ) বলেছেনÑ যে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসল, আল্লাহর জন্য ঘৃণা করল, আল্লাহর জন্য দান করল, আল্লাহর জন্য দান করা থেকে বিরত থাকল যে তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করে নিল।”
এখানে অলস ও নিস্ক্রিয় লোকদের ব্যাধি ও তার প্রতিকার আলোচনা করা হয়েছে।
*৩৯ নং আয়াত -
যদি আল্লাহর পথে জিহাদে বের না হলে দুটো শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে ঃ
১. বড় পীড়াদায়ক আযাব (পরকালে)
২. তোমাদের স্থলে অপর কোন জাতিকে, দলকে অথবা গোষ্ঠীকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে।
(১) পরকালের শান্তি - দুনিয়ার কোন শাস্তি বা কষ্টের সাথে তুলনা চলে না। আখেরাতের আগুনের তীব্রতা দুনিয়ার আগুনের চেয়ে অনেক অনেক গুণ তীব্র। (৭০ থেকে ৭০০ গুণ) দোযখের আগুনের রং কালো
  দুনিয়ায় লালচে < নীল < সাদা < কালো (পরকালে)
আখিরাতে সবই ঈড়হঃরহঁড়ঁং কোন শাস্তির তীব্রতা দুনিয়ার মত টঢ়-ফড়হি করে না বরং টঢ় করতে পারে।
(২) অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন আজ তারই প্রমাণ।
আল্লামা ইকবাল হল সূর্যসেন হল নামকরণ, ঢা. বি. একরা শব্দটি বাদ দেয়া।
সলিমূল্লাহ মুসলিম হল থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া।
ইরাকের উপর আক্রমণ-
অন্যভাবে চিন্তা করলে-
আল্লাহর কাজ তোমাদের উপর নির্ভরশীল নয়। তোমরা করলে তা হবে আর না করলে হবে না, এমন নয়। যদি তোমরা অজ্ঞতার কারণে আল্লাহর দ্বীনের খেদমতের সুযোগ হারাও, তাহলে তিনি অন্য জাতিকে তার সুযোগ দিবেন। এবং তোমরা ব্যর্থ হয়ে যাবে। (সূরা আনকাবুত ৪/৫)
আয়াত নং -৪০
যদি তোমরা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে না আস, তাঁর ডাকে সাড়া না দাও, তাঁর সাহায্য সহযোগিতা না কর, তাঁকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা না কর তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। অতীতে রাসূলের (সঃ) কঠিন সময় ও একাকীত্বে আল্লাহ কিভাবে তাকে সাহায্য করেছিলেন তার একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনা ঃ রাসূল (সঃ) আল্লাহর নির্দেশে বিশ্বস্ত সহচর আবু বকর (রাঃ) কে সাথে নিয়ে হিজরত করেন। তাঁরা সাওর পর্বতের গুহায় অবস্থান করছিলেন। দুশমনরা কয়েকজন খুঁজতে খুঁজতে গিরিগুহার মুখে পৌঁছে গেলো। দুশমনদের পদধ্বনি শুনতে পেয়ে রাসূল (সঃ) এর জীবননাশের আশংকায় আবু বকর (রাঃ) বলে উঠলেন- “আমরাতো দু’জন ব্যক্তি” “এই কাফিরদের কেউ যদি তার পায়ের দিকে তাকায় তবেই তো আমাদেরকে দেখে ফেলবে।” রাসূল (সঃ) বললেন- “হে আবু বকর! তুমি ঐ দু’জনকে কি মনে কর যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ রয়েছেন।” মোটকথা এখানেও আল্লাহ তায়ালা তার রাসূল (সঃ) কে সাহায্য করেছিলেন।
বিষন্ন হয়োনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেনÑ দু’শব্দের এ বাক্যটি বলা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এ নাজুক দৃশ্য সামনে রেখে চিন্তা করলে বুঝতে দেরী হবে না যে, নিছক দুনিয়াবী উপায় উপাকরণের প্রতি ভরসা রেখে মনের এই নিশ্চিন্তভাব সম্ভব হয়। তবুও যে সম্ভব হল তার কারণ এই কাজ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য নিবেদিত এবং আল্লাহই হেফাজত করবেন। এর রহস্য বলা হচ্ছে ঃ
“আল্লাহ তার ক্বলব মোবারকে প্রশান্তি (সাকিনা) নাযিল করেন এবং এমন বাহিনী দ্বারা সাহায্য করেন যা তোমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি।”
আল্লাহ তায়ালা এ সাহায্যের মাধ্যমে কালেমায়ে কুফরকে দাবিয়ে দিয়েছেন এবং নিজের কালেমাকে সমুন্নত করেছেন। তিনি শিরককে নীচু করেছেন এবং তাওহীদ উপরে উঠিয়েছেন। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করে থাকেন। তাঁর ইচ্ছার পরিবর্তন কেউ আনয়ন করতে পারে না। তাঁর সমস্ত কথা ও কাজ নিপূণতা, যুক্তি সিদ্ধতা কল্যাণ ও সৌন্দর্যে ভরপুর।
আয়াত নং ৪১
তোমরা যুদ্ধে বের হও হালকা কিংবা ভারী অবস্থায়।
শব্দ দুটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়Ñ যেমনÑ
১. হালকা ভারী
২. সশস্ত্র নিরস্ত্র
৩. অনুকুল প্রতিকুল
৪. স্বচ্ছলাবস্থায় অস্বচ্ছলাবস্থায়
৫. সুখে দুঃখে
৬. সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টিতে
৭. সমৃদ্ধির মধ্যে হোক দারিদ্রের মধ্যে হোক
৮. বিপুল পরিমাণ সাজ সরঞ্জাম থাক বা একেবারে নিঃসম্বল অবস্থায় থাক।
৯. কাজ থেকে অবসরপ্রাপ্ত হোক, কাজের মধ্যে নিয়োজিত থাক।
১০. পেশাদার হোক বা ব্যবসায়ী হোক
১১. শক্তিশালী হোক কিংবা দুর্বল হোক
১২. যুবক হও আর বৃদ্ধ হও।
অর্থাৎ সর্বাবস্থায় কোন ওযর না করেই দাঁড়িয়ে যেতে হবে এবং জিহাদের জন্য যাত্রা করতে হবে।
আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হচ্ছে তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর তোমাদের মালামাল, ধন সম্পদ দিয়ে ও তোমাদের জান প্রাণ দিয়ে এটাই তোমাদের জন্য উত্তমÑ যদি তোমরা জানতে।
এ প্রসংগে সুরা তাওবারই ১১১ আয়াতে বলা হয়েছেÑ
অর্থ -অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের কাছ থেকে তাদের প্রাণ ও ধন সম্পদ কিনে নিয়েছেন, এর বিনিময়ে তারা জান্নাত লাভ করবে। এরা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, অতঃপর (এই জিহাদে কখনো কাফেরদের) তারা হত্যা করে (কখনো আবার শত্রুর হাতে) তারা নিজেরা নিহত হয়। (মোমেনদের সাথে) এই খাঁটি ওয়াদা (এর আগে) তাওরাতে ও ইনজীলেও করা হয়েছিলো। (আর এখন তা) এই কোরআনে (করা হচ্ছে) এই ওয়াদা পালন করা আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব দায়িত্ব আর আল্লাহর চাইতে কে বেশী ওয়াদা পূরণ করতে পারে? অতএব (হে মোমেনরা) তোমরা তাঁর সাথে যে কেনাবেচার কাজটি (সম্পন্ন) করলে তাতে আনন্দ প্রকাশ করো এবং এটি হচ্ছে এক মহাসাফল্য।
সূরা আসসাফের ১০-১৩ আয়াতে বলা হয়েছে
১০. হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, আমি কি তোমাদের এমন একটি (লাভজনক) ব্যবসার সন্ধান দেবো, যা তোমাদেরকে (মহাবিচারের দিন) কঠোর আযাব থেকে বাঁচিয়ে দেবে।
১১. (ব্যবসাটি হচ্ছে) তোমরা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবে নিজেদের ধন ও প্রাণের সাহায্যে। এটিই তোমার জন্য মঙ্গল। যদি তোমরা (কথাটা) বুঝতে পারতে।
১২. (এমনটি করলে) আল্লাহ তোমাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং শেষ বিচারের দিন তিনি তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন এক (সুরম্য) জান্নাতে যার নিচ দিয়ে ঝর্নাধারা প্রবাহিত; আর চিরন্তন জান্নাতের স্থায়ী নিবাসস্থলের সুন্দর (পবিত্র) গৃহে প্রবেশ করাবেন। এটিই হচ্ছে সবচাইতে বড়ো সাফল্য।
১৩. আরো একটি অনুগ্রহ তোমাদের একান্ত কাম্য এবং তা হচ্ছে আল্লাহর সাহায্য ও (ময়দানের) আসন্ন বিজয়। কাজেই মোমেন বান্দাদেরকে সুসংবাদ দাও।
এটা তোমাদের জন্য অতি উত্তম ঃ
আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন ঃ লোকদের মধ্যে সর্বোত্তম জীবন হচ্ছে সে ব্যক্তির জীবন, যে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে সব সময় আল্লাহর (দ্বীন প্রতিষ্ঠার) পথে জিহাদ করার জন্য তৈরি থাকে। যেখানেই সে কোন বিপদ বা পেরেশানীর কথা শুনতে পায় সংগে সংগেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাতাসের বেগে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হত্যা ও মৃত্যুকে তার পথে খোঁজ করতে থাকে। আর দ্বিতীয় সে ব্যক্তির জীবন যে পর্বতের চূড়ায় বা উপত্যকায় কয়েকটি ছাগল সংগে নিয়ে বসবাস করে, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয়, আর আমৃত্য নিজের বরের ইবাদত করে এবং মানুষের কল্যাণ ছাড়া সে আর কিছুই করে না। (মুসলিম)
* আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন ঃ জান্নাতে একশতটি দরজা আছে। আল্লাহর পথে জিহাদকারী মুজাহিদদের জন্য আল্লাহ তা তৈরি করেছেন- তার দুটি দরজার মাঝখানের দূরত্ব আসমান ও যমীনের মাঝখানের দূরত্বের সমান।
“রাসূল (সঃ) বলেন -আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে জিহাদকারীর জন্য এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন যে, হয় তাকে শহীদ করে জান্নাতে প্রবিষ্ট করাবেন না হয় গনীমতসহ নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে আনবেন।”
*জিহাদের পুরস্কার ঃ
১. গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে।
২. জান্নাত দেয়া হবে যার তলদেশে একাধিক ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
৩. আল্লাহর সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়।
৩নং পুরস্কার আল্লাহ দিতেও পারেন নাও দিতে পারেন। যদিও দুনিয়ার জীবনে এটিই আমাদের বেশী প্রিয়।

*শিক্ষাঃ-

১. দুনিয়ার জীবনকে পরকালের উপর প্রাধান্য দেয়া যাবে না।
২. জিহাদ না করলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে
      (ক) পরকালে কঠিন আযাব
      (খ) অন্য জাতি কর্তৃক লাঞ্ছনা
৩. আমরা জিহাদ না করলে আল্লাহ তায়ালার কোন ক্ষতি নেই।
৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহর (ঝডঞ) উপর ভরসা রাখতে হবে।
৫. যে কোন অবস্থায় যে কোন পরিস্থিতিতে আল্লাহর পথে বের হওয়ার ডাক আসলে বের হয়ে যাওয়া ফরয।
বাস্তবায়ন ঃ
আলোচ্য দারসটিকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হলেÑ
প্রথমত ঃ আমাদেরকে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করতে হবে বেশি বেশি আখিরাতের কামিয়াবির কথা ভাবতে হবে।
দ্বিতীয়ত ঃ আমাদেরকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্র পথে জান ও মাল দিয়ে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে।
তৃতীয়ত ঃ যে কোন কাজে, যে কোন অবস্থায় যে কোন পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর অটল অবিচল ভরসা রাখতে হবে।